Advertisements
Rate this post

বিশ্বব্যাপী পরিচিত পরিবেশগত আন্দোলন গুলির মধ্যে অন্যতম হল চিপকো আন্দোলন। বিশ্ব বিখ্যাত এই চিপকো আন্দোলনের পরিচালনে যে NGO সংস্থাটি গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে সেটি হল গোপেশ্বরের দাসোহলি গ্রাম স্বরাজ্য মণ্ডল। হিমালয় পর্বতের অমূল্য অরণ্য সম্পদকে রক্ষা করার জন্য ১৯৭৩ সালে থেকে এই আন্দোলনের সূচনা হয়। চিপকো আন্দোলন কে কৃষকদের আন্দোলন বা মহিলাদের আন্দোলন যা হিসাবেই অনুমান করা হোক না কেন সর্বপরি এটি ছিল ভারতের প্রথম সংগঠিত পরিবেশ আন্দোলন।

Advertisements

চিপকো আন্দোলনের পটভূমি
চিপকো আন্দোলনের মূল বা শিকড় অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে এই আন্দোলনের সূচনায় মূলে রয়েছে স্বাধীনতার পূর্বে ১৭৬৩ সালে ঘটে যাওয়া রাজস্থানের বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষদের দ্বারা খেজরি গাছ কে রক্ষার জন্য প্রানের বলিদান। চিপকো আন্দোলন ও বিষ্ণোই আন্দোলনের মানুষদের মধ্যে অরণ্য সংরক্ষণের পন্থার দিক থেকে অনেকটা সমতা লক্ষ্য করা যায়।

উত্তরাখন্ডের গাড়োয়াল ও কুমায়ুন হিমালয়ের অন্তর্গত চামোলি জেলায় চিপকো আন্দোলনের সূচনা হয়। এই অঞ্চলটি ভাগীরথী ও অলকানন্দার নদীর মতো প্রধান প্রধান নদীর উৎস। সরকার এই অঞ্চলের অরণ্য সম্পদ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। তাই এই অঞ্চলের বসবাসকারী গ্রামীন গরীব মানুষরা যারা এই অরন্যের উপর নির্ভর করে জীবন ধারন করতেন তারা এই অরণ্য ধ্বংসকারী সরকারী প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করে। বিশেষ করে মহিলারা এই আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করে।

স্থানীয় সংস্থা Dashauli Gram Swarajya Sangh (DGSS) ১৯৭৩ সালে স্থানীয় মানুষদের কৃষি সরঞ্জাম তৈরির জন্য বন দপ্তরের কাছে ১০ টি করে ছাই বৃক্ষ প্রদানের অনুরোধ করেছিলেন, কিন্তু বনদপ্তর তা দিতে অগ্রাহ্য করেন পরিবর্তে তারা বিদেশী সাইমন্ড কোম্পানীকে ৩০০ টি ছাই বৃক্ষ প্রদানের অনুমতি প্রধান করে। যা স্থানীয় মানুষদের মধ্যে অসন্তোষের উদ্ভব ঘটায়। তারপর ১৯৭৩ সালের মার্চ মাসে সাইমন্ড কোম্পানীর কিছু কর্মচারী তাদের বরাদ্দ ৩০০ বৃক্ষ কাটতে এলে স্থানীয় মানুষ জন ড্রাম বাজিয়ে, লোকগীত গেয়ে তাদের বিরোধীতা করেন।

গোপেশ্বরের দাসোহলি গ্রাম স্বরাজ্য মণ্ডল সংগঠনের নেতা চন্ডী প্রসাদ ভাট গাছকে আলিঙ্গন করার এক চমৎকার বুদ্ধি নিয়ে আসেন। চিপকো একটি হিন্দি শব্দ যার অর্থ জড়িয়ে ধরা বা আলিঙ্গন। এই ভাবেই চিপকো আন্দোলনের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে সাইমন্ড কোম্পানী কে ফাতা বন থেকে গাছ বরাদ্দ করা হয়, কিন্তু সেখানেও তারা বিরোধীতার সম্মুখিন হয়। তারপর বন দপ্তর DGSM সংগঠনকে একটি করে বৃক্ষ কাঁটার অনুমতি দেন কিন্তু DGSM সংগঠন তা প্রত্যাখান করেন, পড়ে বন দপ্তর ১০ টি গাছ কাটার অনুমতি দিলেও তারা সেটিও প্রত্যাখান করে দেন। সবশেষে বনদপ্তর সাইমন্ড কোম্পানীর গাছ কাঁটার অনুমতি বাদ করতে বাধ্য হয়।

চিপকো আন্দোলন এরপর তৎকালীন উত্তরপ্রদেশের (বর্তমানে উত্তরাখন্ড রাজ্য) অন্যান্য পার্বত্য জেলা ছড়িয়ে পড়ে, যেমন – রেনি, তেহরি, কুমায়ন ও বৈদ্যগড়। ঠিক এইসময় সরকার কর্তৃক উক্ত অঞ্চলের অরন্যের একটি বড়ো অংশ নিলামে বিক্রি করেদেন এবং এর ফলে কেবলমাত্র রেনি অরণ্য অঞ্চলই ২০০০ মতো গাছ কাটা পরার সম্ভাবনা দেখা যায়। যা এই আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ন টার্নিং পয়েন্টে পরিনত হয়। এখানে DGSM এর নেতা চন্ডী প্রসাদ ভাটের নির্দেশ মতো উক্ত অঞ্চলের গ্রামীন মহিলারা গৌরি দেবীর নেতৃত্বে গাছ গুলোকে আলিঙ্গন করে বৃক্ষচ্ছেদন থেকে রক্ষা করেন।

পরবর্তী সময়ে এই আন্দোলন আরো জোড়দার হলে তৎকালীন উত্তরপ্রদেশ সরকার ব্যাপারটি পর্যালোচনা করার জন্য উচ্চ পদস্থ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন এবং এই কমিটির রিপোর্টে এটি প্রমানিত হয় যে ১৯৭০ সালে এই গারোয়ার অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যার মূল কারণ ছিল অলকানন্দার উচ্চ অববাহিকায় প্রচুর বৃক্ষচ্ছেদন। এই রিপোর্ট অনুসারে উত্তরপ্রদেশ সরকার আগামী দশ বছর অলকানন্দার উচ্চ অববাহিকায় সম্পূর্ন রূপে বৃক্ষচ্ছেদন বন্ধ করে দেয়।

পরবর্তী সময়ে হিমালয় অঞ্চলে বৃক্ষচ্ছেদনকে সম্পূর্ন রূপে বন্ধ করার জন্য ১৯৮১ সালে এপ্রিল মাসে চিপকো আন্দোলনের অপর এক নেতা সুন্দরলাল বহুগুনা আমরন অনশনে বসেন। তার ফলস্বরূপ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্ডিরা গান্ধী সুন্দরলাল বহুগুনার সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং হিমালয় অঞ্চলে ১৫ বছরের জন্য বানিজ্যিক ভাবে বৃক্ষচ্ছেদন সম্পূর্নরূপে নিষিদ্ধ করে দেন। এভাবে চিপকো আন্দোলন ধাপে ধাপে সফলতার দিকে এগিয়ে যায়। সবশেষে বলা যেতে পারে চিপকো আন্দোলন পরিবেশ আন্দোলনের চেয়ে মানুষের বেঁচে থাকার আন্দোলন হিসাবে বেশি পরিচিত এবং এই আন্দোলনে নারী সমাজের অংশ গ্রহন অন্যতম গুরুত্বপূর্ন একটি দিক।

সুন্দরলাল বহুগুনা ও চন্ডী প্রসাদ দাস ছিলেন চিপকো আন্দোলনের প্রধান দুই ব্যক্তিত্ব, যাদের সরলতা ও নেতৃত্ব প্রদানের দক্ষতা এই আন্দোলনকে সফলতার দিকে এগিয়ে দিয়েছিল।চিপকো আন্দোলন আন্তর্জাতিক পরিচিতি লাভ করে এবং এটিকে তৃতীয় বিশ্বের প্রথম তৃণমূল কেন্দ্রিক বাস্তুসংস্থানিক আন্দোলন বলা যেতে পারে। এই চিপকো আন্দোলনের পথ ধরে পরবর্তীকালে ভারতে আরো অনেক পরিবেশ আন্দোলন সফলতা অর্জন করে।

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *